কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র/কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বাংলা/ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র টিকা/কৌটিল্যের রাষ্ট্রদর্শন

 

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র:-

কৌটিল্য ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ, তেজশ্রী ও প্রচণ্ড কূটবুদ্ধি সম্পন্ন রাষ্ট্রনীতিবিদ। সম্ভবত কৌটিল্যর অপর নাম চাণক্য। কথিত আছে তক্ষশীলার এই ব্রাহ্মণ পণ্ডিত পাটলিপুত্রের প্রকাশ রাজসভায় মগধরাজ ধননন্দ কর্তৃক অপমানিত হলে নন্দবংশের উচ্ছেদ সাধনে, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ভাগ্যন্বেষী, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শক্তি ও কৌটিল্যের বংশের পতন ঘটায় কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। কৌটিল্যের রাষ্ট্রনীতি ধারণা ছিল যে শক্তিমান মাএেই যুদ্ধ করবে এবং শত্রু নিপত্তি করবে। কৌটিল্যের রচিত ‘অর্থশাস্ত্র’গ্রন্থটি শুধু রাজনীতি অর্থনীতি বিষয়ক গ্রন্থ নয়। এ গ্রন্থ থেকে তৎকালীন সময়ের সামাজিক ,অর্থনৈতিক ,ও রাজনৈতিক জীবনের রূপরেখা পাওয়া যায়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র কে আধুনিক যুগের ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থের সঙ্গে তুলনা করে কৌটিল্যকে ‘ভারতের মেকিয়াভেলি’ বলা হয়।

কৌটিল্য বা চাণক্য রচিত অর্থশাস্ত্র মৌর্য শাসন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদান বলে বিবেচিত. হলেও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা ও এর রচনাকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কীর্থ, জোলি, ভিনটারনিজ প্রভৃতি ঐতিহাসিকগনদের মতে কৌটিল্যের দ্বারা রচিত হত, তাহলে এই গ্রন্থে মৌর্য সাম্রাজ্য ও তার শাসন ব্যবস্থার বৃস্তিত বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকত।

কিন্তু এই গ্রন্থে গ্ৰীক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিসের কর্তৃক উল্লেখিত পৌর শাসন ব্যবস্থা ও সামরিক বোর্ডগুলোর কোন উল্লেখ নেই। ঐতিহাসিক জোলি অর্থশাস্ত্রকে বা তার রচয়িতা কে কূটনীতিজ্ঞ বলে মনে করেন না। অপরদিকে এ.এল ব্যাসাম অর্থশাস্ত্রকে মৌর্যযুগের রচনা বলে মনে করেন না, যদিও তিনি মনে করেন যে এই গ্রন্থটি নিশ্চিতভাবে মৌর্যযুগের স্মৃতি বহন করে।

কিন্তু ফ্লীট, জয়সোয়াল, শ্যামাশাস্ত্রী প্রমূখ ঐতিহাসিকগণ উপরিক্ত যুক্তিগুলো সমর্থন করেনা এবং তাদের মতে অর্থশাস্ত্র চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী কৌটিল্যের দ্বারা রচিত হয়েছিল। ভারতীয় জনশ্রুতি ও ভারতীয় গ্রন্থটিতে কৌটিল্যের উল্লেখ্য পাওয়া যায়। জৈন ও বৌদ্ধ গ্রন্থাদি, পঞ্চতন্ত্র ও পুরাণে কৌটিল্যের উল্লেখ আছে। পুরানে কৌটিল্যকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

অর্থশাস্ত্রের বিবরণ:-

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বিবরণ অনুযায়ী মনে হয় বর্ণিত রাজ্যে সুনিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা ছিল। রাজা ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বময়প্রভু। রাজার ক্ষমতা অবাধ থাকলেও তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে কঠোর নির্দেশ ছিল। কৌটিল্যের মতে রাজধর্ম পালনের রাজা ন্যায় ধর্মের কাছে বাধ্য থাকত। এই শর্তে তিনি প্রজাবর্গের নিকট থেকে কর গ্রহণের অধিকার লাভ করতেন। রাজা নারীদের মর্যাদা ও প্রজাদের সম্পত্তি রক্ষা করতে বাধ্য থাকতেন। রাজার উপযুক্ত শিক্ষা ও আত্মসংযোগ এর ওপর অর্থশাস্ত্রে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে’সবকিছুই অর্থ উপর নির্ভরশীল’সুতরাং রাজকোষের প্রতি অধিক দৃষ্টি দিতে হবে। এতে বিচারকার্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কৌটিল্যের 18 প্রকার দন্ডবিধির কথা উল্লেখ করেছেন।7 প্রকার বেত্রাঘাতের কথাও অর্থশাস্ত্রের বলা হয়। সাধারণত ব্রাহ্মণগণ প্রাণদণ্ড থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতেন।কিন্তু রাজদ্রোহী তার অপরাধে অভিযুক্ত ব্রাহ্মণদের জীবন দগ্ধ করার পরিবর্তে জলে ডুবিয়ে মারার নির্দেশ অর্থশাস্ত্র দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রের সাধারণ শাসনব্যবস্থা সম্পর্কেও অর্থশাস্ত্রে অনেক তথ্যর কথা বলা হয়েছে ‌। শাসনকার্যে সুবিধার জন্য সমগ্র সাম্রাজ্যে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয় এবং সাধারণ রাজ পরিবার থেকেই প্রাদেশিক শাসন কর্তাগন নিযুক্ত হতেন। অর্থশাস্ত্র প্রধানত রাজতন্ত্র সম্মত শাসন ব্যবস্থার আলোচনা করা হলেও স্ব-শাসিত উপজাতি ও স্বায়ত্তশাসিত গ্রামগুলির উল্লেখ সেখানে দেখা যায়। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক সম্বন্ধে ও কৌটিল্য বিশদভাবে আলোচনা করেন।

অর্থশাস্ত্র সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ‘জনপদনিকা’শীর্ষক অধ্যায়ে সমাজ সংগঠন সম্পর্কে বিশষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এতে নারীদের সম্পর্কে বৃস্তিত আলোচনা করা হয়েছে। বিবাহের পূর্বে ও পরে নারীগণ যথাক্রমে পিতা ,ভ্রাতা স্বামী ও পুত্রের অভিভাবকত্বে থাকতেন।

অর্থশাস্ত্র পুরুষ ও নারীর বিবাহ অবশ্য কর্তব্য বলে নির্দেশ দেওয়া হলেও বিবাহের বয়সের সম্পর্কে কিছু কাহিনী ও বৈবাহিক চুক্তির উল্লেখ আছে । এতে গণিকা রুপজীবিকার উল্লেখ আছে। অর্থশাস্ত্রে এইসব বিষয় ছাড়াও জনসাধারণের অর্থ- সামাজিক অবস্থা আচার ব্যবস্থার ক্রীড়া কৌশলের উল্লেখ আছে।

Leave a Comment

Translate »