হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব ও বিস্তৃতি নির্নয় কর

                     হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ।ঐতিহাসিক উইল ডুরান্টের মতে এই সভ্যতা মিশরীয় সভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীন। এই সভ্যতার প্রাচীনত্ব বা কালসীমা নির্ণয় খুবই দুরূহ।  এবং এ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ অন্ত নেই এছাড়া নিত্যনতুন বিচার পদ্ধতি ও তথ্য আবিষ্কারকালে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা নিয়ত পরিবর্তনশীল ।তবে বর্তমানে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছাড়াও রেডিও কার্বন পদ্ধতির সাহায্যে পরীক্ষা করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হরপ্পা সভ্যতার কাল নির্ণয় সম্পর্কে মতামত দেয়া সম্ভবপর হয়েছে।
                     এই সভ্যতার কালানুক্রম সংক্রান্ত সমস্যার দুটি দিক আছে একটি হল নিম্নতম অপরটি হল উর্ধতম কাল নির্ণয়। নিম্নতম কাল নির্ণয়ের ব্যাপারে সমস্যা অনেক কম। কারণ একমাত্র লৌহের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি দ্বারা  কাল নির্ণয় করা যায়। কিন্তু সিন্ধু উপত্যকার লৌহের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি ।পশ্চিম এশিয়ার খ্রিস্টীয় জন্মের প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে লোহার ব্যবহার প্রচলন ছিল। এই ব্যবহারের সাথে সিন্ধু অঞ্চলের আদিবাসীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ।সুতরাং হরপ্পা সংস্কৃতির নিম্নতম কালসীমা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব পরে স্থির করলে সিন্ধু উপত্যকার অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা করা চলে না। যেজন্য পণ্ডিতগণ তারিখটিকে মোটামুটি নিম্নতম সময়সীমা বলে গ্রহণ করেন।
                     ভারতে আর্য আগমনের আনুমানিক সময় ছিল ১৫০০ খি: পূর্বাব্দে। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান থেকেও এই মতের সমর্থন পাওয়া যায় ।এই মতের ভিত্তিতে হরপ্পা সংস্কৃতির নিম্নতম সময়সীমা স্থির করা যেতে পারে।
                     কিন্তু হরপ্পা সংস্কৃতির উর্ধতম সময়সীমা অনেক বেশি জটিল। প্রথমদিকে ঐতিহাসিকরা প্রধানত হরপ্পা সংস্কৃতি ও মেসোপটেমিয়া সংস্কৃতির মধ্যে আবিষ্কৃত সাদৃশ্যের ওপর নির্ভর করে হরপ্পা সংস্কৃতির সূচনাকাল যতদূর  সম্ভব পিছনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে সিন্ধু উপত্যকায় তথ্য থেকে মার্শালের মতে সমর্থন পাওয়া যায়। সিন্ধু উপত্যকার কয়েকটি সীলমোহর মেসোপটেমিয়া ব্যবলন প্রভৃতি স্থানে পাওয়া গিয়েছে ।নানাভাবে পরীক্ষা করে মি: গার্ড এইসব  সীলমোহরের  কাল সীমা 2400 -1500খ্রী: পূর্ব পর্যন্ত স্থির করে ।টেল আসমারে প্রাপ্ত সিন্ধু অঞ্চলের দুটি সীলমোহরের কাল সীমা ড: ফ্রাঙ্কফোটে 2400 খ্রিস্টপূর্ব নির্ণয় করে। তাছাড়া স্বাভাবিক ভাবে মনে করা যেতে পারে যে, সিন্ধু সভ্যতার ক্রমবিকাশের জন্য দীর্ঘকালের প্রয়োজন ছিল ‌সাধারণত সিন্ধু উপত্যকার ক্রমবিকাশের সময়কে 500 বছর ধরা হয়েছে। এই ভাবে হিসাব করলে 2400+500=3300খ্রী:পূ:কেএই সভ্যতার জন্ম লগ্ন স্বরূপ নির্ণয় করা হয় কিন্তু হুইলার এর মত মানতে অস্বীকার করে এবং তিনি সিন্ধু সভ্যতার আয়ষ্কাল2500-1500খ্রী:পূ: বলে সিদ্ধান্ত করেন।

সমালোচনা:-
             তবে হুইলার এর 1000 বছরে সময়সীমা বর্তমানে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না।সুতরাং সভ্যতার পক্ষে কোন ভাবে পরিবর্তিত না হয়ে দীর্ঘ 1000 বছর তার অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। রেডিও কার্বন পরীক্ষায় প্রাপ্ত তারিখগুলি তাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।ড: অগ্রবাল প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পরীক্ষা করে বলেন যে হরপ্পা সংস্কৃতিকে খ্রিস্টপূর্ব 2400 অব্দে স্থাপন করার পক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই।বুকানন প্রায় একই প্রকার অভিমত প্রকাশ করেন।মেসোপটেমিয়ার প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন যে,সিন্ধু সভ্যতা বিকাশের সময় খ্রিস্টীয় পর্ব 2300 অব্দ নির্ণয় করা যেতে পারে। সুতরাং তাঁর মতে খ্রিস্টপূর্ব 2000 অব্দে এই সভ্যতার ধ্বংস হয়।লারসার রাজা গুনগুন সারের রাজত্বের দশম  বর্তে প্রচারিত একটি ফলসে সিন্ধু উপত্যকার  সিলের ছাপের অনুরূপ একটি ছাপ পাওয়া গিয়েছে। এইসব নিদর্শন থেকে মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে,মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন শহরে খননকার্যের ফলে সিন্ধু উপত্যকার সিলের অনুরূপ যেসব সিল পাওয়া গিয়েছে তার অধিকাংশ সারগনের রাজত্বকাল, হোসেন যুগে এবং লালসার  যুগের সমসাময়িক ।সুতরাং বলা যায় যে, প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সমূহের দ্বারা এই দুটি সভ্যতার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সময়কাল সামনে করা হয়েছিল। রেডিওকার্বন পরীক্ষা করে ঘোষণা করেন যে হরপ্পার সাথে পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ খ্রী:পূর্বাব্দ 2350 থেকে 2000 এর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল। রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে নির্মিত এই সময়কালীন সিন্ধু সভ্যতার বিকাশের যুগ বলে মনে করা হয়।

হরপ্পা সভ্যতার বিস্তৃতি:-
                        প্রাক ঐতিহাসিক যুগের সভ্যতার নিদর্শন সর্বপ্রথম হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয়। এই দুটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব 440 মাইল এ মতো হলেও দুটি স্থানের সভ্যতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য দেখা যায় ।এ  সাদৃশ্য থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এই সভ্যতা আঞ্চলিক ছিল না ।অথবা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না ।বিভিন্ন হরপ্পা সংস্কৃতির সহিত  সাদৃশ্যপূর্ণ নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। এবং বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত এই সকল প্রাচীন নিদর্শন থেকে প্রমাণিত হয় যে মহেঞ্জোদারো থেকে হরপ্পা পর্যন্ত এলাকার মধ্যে এই সভ্যতার বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রত্নতত্ত্ববিদ এম.জি.মজুমদার পরিচালিত সিন্ধু দেশে উত্তোলনের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোরানের 60 মাইল উ: পূ: অবস্থিত ফারুকাবাদা থেকে দ: দিকে গুজোও বিজনয় এবং উঃ দিকে জেকোকাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ।সিন্ধু নদের অববাহিকায ও খিরথর পর্বতমালার অন্তর্বর্তী অঞ্চলের  স্তূপের মধ্যে সিন্ধু সভ্যতার  বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।প্রাগৈতিহাসিক যুগে দক্ষিণ ও উত্তর সিন্ধুর মধ্যে যোগাযোগের পথের পাশে এই সভ্যতার কেন্দ্রগুলি গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদের পূঃ তীরে অবস্থিত লৌহ মহেঞ্জোদারো, আদিমুরাদ, জুকার, গাজিমাছ আলোর প্রভৃতি স্থানে সিন্ধু সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনেক নিদর্শন পাওয়া গেছে। স্যার  আরেলস্টাইন এর উৎখননের ফলে আরও পশ্চিম দিকে অবস্থিত দাবার  কোটি,সুর,উৎকল উঃ বেলুচিস্তান খন্ডন দঃ বেলুচিস্তান,এর চুল্লিমেহি প্রভৃতি স্থানে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। স্যার অরেলস্টাইন এর মতে সিন্ধু সভ্যতার সাহিতুহ্ম  পর্যন্ত বৃস্তিত ছিল।
                        বক্সার ,পাটনা প্রভৃতি স্থানে পোড়ামাটির বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হওয়ার স্পষ্ট বোঝা যায় যে ,পূর্ব ভারতের বিভিন্ন স্থানে সিন্ধু সভ্যতার প্রভাব বিস্তৃত  হয়েছিল। সিন্ধু অঞ্চলের আবিষ্কৃত চিত্রলিপি ধাতুপাথর, পোড়ামাটির বিভিন্ন শ্রেণী, বেনারস ও গাজীপুরে আবিষ্কৃত হয়েছিল।
                       
                       হরপ্পা থেকে 200 মাইল পূর্বে দিকে অবস্থিত সিমলা পাহাড়ের পাদদেশে আম্বালা জেলার শতদ্রু নদীর তীরে অবস্থিত। রূপারের কাছে কোটলা শিহাধখান  নামক স্থানে সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শনগুলো  আবিষ্কৃত হয়েছে ।গুজরাটের উপকূল অঞ্চলে লোথাল সামুদ্রিক বন্দরের সন্ধান পাওয়ার পর  সিন্ধু উপত্যকার এক নতুন দিগন্তের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে ।বিভিন্ন স্থানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আবিষ্কৃত হবার পর স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায় যে, সমগ্র সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলের  কাবিওয়ারে  এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পার্শ্ববর্তী সমুদ্রতীরে রাজপুতনার কাছে কিছু স্থানে উত্তর-পূর্ব সীমান্তপ্রদেশ ও গাঙ্গেয় অববাহিকার কোন অঞ্চলে এই সভ্যতার বিস্তার লাভ করেছিল। এইসব কারণে বর্তমানে পণ্ডিতগণের সিদ্ধান্ত সিন্ধু সভ্যতার স্পষ্ট জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে উত্তর-পূর্ব  ছাড়াও দক্ষিণ পূর্ব ভারতের বিস্তার সাধনে সমর্থ হয়।

Leave a Comment

Translate »