হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের কারণ গুলি নির্ণয় কর:-

হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসের কারণ গুলি নির্ণয় কর:-

                    উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই মানবজীবনের ইতিহাসের রথচক্র প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সভ্যতার ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম নয় ।উত্থান থাকলে পতন অবসম্ভাবীক। হরপ্পা সভ্যতার পতনের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে সত্য। হরপ্পা সভ্যতা বিশ্বের একটি আশ্চর্য সভ্যতা বলে পরিগণিত হয়েছে। প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে এই সভ্যতার পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি উন্নত মান অনুমিত হয়েছে। তা সত্যই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। হরপ্পা সভ্যতায় বিশ্বের নগর পরিকল্পনা নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা ও জনকল্যাণ মূলক। পৌরসংস্কার প্রথম সূত্রপাত রচনা করেছিল। তবে এই সভ্যতা অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে। আনুমানিক ,1500 খ্রী: পূর্বাব্দ নাগাদ হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস হয়। ধ্বংসের  কারণ নিয়ে পন্ডিতের  মধ্যে বির্তকের অন্ত নেই। সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন গবেষণা ও ওই অঞ্চলের প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে সিন্ধু সভ্যতার কয়েকটি সাধারণ কারণ নির্ণয় করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন:-
                মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা আবিষ্কৃত ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করে চলা যায় যে ,খ্রিস্টপূর্ব 3000 অব্দে সিন্ধুনদ বিধৌত অঞ্চলে  নিয়মিত প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবিষ্কৃত গন্ডার, হাতি , প্রভৃতি জীবজন্তুর পথিকৃত অঙ্কিত থেকে  সীলমোহর প্রমাণিত হয় যে বর্তমানকালের তুলনায় এই অঞ্চলে তখন অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হত। এবং বনজঙ্গলকীর্ণ জলাভূমির অভাব ছিল না।
                পরবর্তীকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ  ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। বৃষ্টিপাতের সল্পতার তার জন্য ভূমি  অনুর্বর ও শুষ্ক হতে থাকে ।জমির শুষ্কতার জন্য তার উর্বরতা হ্রাস পায় এবং অনুর্বর জমি কৃষিকাজের পক্ষে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে ।জলীয় বাষ্পের সঙ্গে অভ্যন্তরস্থ  লবণ বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ভূপৃষ্ঠ জমা হতে থাকে‌। অনবরত শুষ্কতা বৃদ্ধির ফলে সমগ্র অঞ্চলের মরুসদৃশ্য হয়ে পড়ে ।খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে আলেকজান্ডারের অভিযান সমসাময়িক রচিত গ্রিক ঐতিহাসিক বিবরণ ও এই মত সমর্থন করে।
                আলেকজান্ডার সৈন্যবাহিনী যখন মাকরানের বৈচিত্রহীন বসতিশূর্ণ অঞ্চল অতিক্রম করে এই অঞ্চল তখনও মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।বসতি স্থাপনের অযোগ্য ভূমি ত্যাগ  করে সিন্ধু অঞ্চলের আদিবাসীরা তাই অন্যত নতুন বসতি স্থাপনে উদ্যোগী হয় ।তবে কৃষিকার্যের পক্ষে উপযুক্ত জমির জন্য স্থানীয় অধিবাসীরা ও অনেকাংশে দায়ী ছিল । ইট পড়াবার জন্য তারা  যথেষ্টভাবে বনসম্পদের  অপচয় করত ।এবং জল সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য  অবশ্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকেও তাদের কোন প্রকার দৃষ্টি ছিল না। ফলে কৃষি কাজে যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। তাছাড়া কৃষিক্ষেত্রের অবনতির জন্য স্থানীয় আদিবাসীদের রক্ষনশীল ও সামাজিক ও অর্থনৈতিক রাজনৈতি অনেকাংশে দায়ী ছিল।

নাগরিক জীবনের অবনতি:-
                 সিন্ধু অঞ্চলের ধীরে ধীরে নাগরিক জীবনের অবনতির বিভিন্ন চিহ্ন বিশেষভাবে প্রকোট হয়ে ওঠে। নাগরিক জীবনের এইসব সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল।মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষের সাতটি স্তরের  মধ্যে সর্বোপরিস্তরে দেখা যায় যে বস্তির সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।পুরাতন ও পরিতক্ত ভিত্তির ওপর নতুন গৃহ নির্মাণ ও অতিরিক্ত সংখ্যক লোকের বসবাসের জন্য প্রশস্ত কক্ষগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বন্টন বাড়িগুলো যে আইনিভাবে রাজপথের একাংশ অধিকার করতে শুরু করে । এ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের মন্তব্য করেছেন যে,Later de mohenjodaro  and by inference Harappa and rest were poor shodows of former seleves’।

বন্যার প্রকোপ:-
               ক্রমবর্ধমান বন্যা ভীতি ও মহেঞ্জোদারো প্ররিতক্ত হওয়ায অন্যতম প্রধান কারণ সিন্ধু নদীতে অনবরত বায়ু সঞ্চিত  হবার ফলে নদীঘাত অগভীর হয়ে পড়ে ও বর্ষাকালে নিয়মিতভাবে প্লাবন দেখা দিতে থাকে। খননকার্যের ফলে দেখা গিয়েছে যে মহেঞ্জোদারোর নাগরিক নিকট 43 ফুট প্রশস্ত একটি বাঁধ তৈরি করা হয় ।এবং বন্যার প্রকোপের  হাত থেকে অন্যতি পাওয়ার জন্য পোড়াইঁটের তৈরি করা হয়। নির্মিত একটি প্রয়প্রণালীকে আরও 14 ফুট উঁচু করে তৈরি করার ব্যবস্থা করা হয় ।বন্যার হাত থেকে মহেঞ্জোদারোকে রক্ষা করার জন্য এই সব ব্যবস্থা গ্রহীত হয় ।মহেঞ্জোদারকে বাড়ি ঘর নির্মাণের জন্য রৌদ্রে  শুকানো ইটের পরিবর্তে আগুনে পোড়া ইট এর অতিরিক্ত ব্যবহার বন্যার প্রকোপ  প্রমাণ বহন করে।জর্জ.ফ.ডায়েস  এর মতে হরপ্পা আদিবাসীদের প্রধান শত্রু ছিল প্রকৃতি ।স্থানীয় আদিবাসীগন হরপ্পা নাগরির পতনের জন্য প্রকৃতিকে বিশেষ ভাবে দায়ী করে। অতিরিক্ত পশুচারণ ও বনজ সম্পদ ধ্বংসের দ্বারা প্রাকৃতিক বিভাজ্য নষ্ট করে।

ভূমিকম্প তত্ত্ব:-
             অনেকের মতে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে হরপ্পা নগর বলি ধ্বংস হয়েছিল। এবং সিন্ধু উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চলই ছিল ভূমিকম্পের উৎসস্থল ।তাদের যুক্তি সমর্থনে তার মহেঞ্জোদারোতএ প্রাপ্ত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলির কথা বলে থাকেন ।কঙ্কালগুলো গায়ে ক্ষতচিহ্ন সম্ভবত ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার জন্য মৃতদেহগুলি গায়ে ক্ষত চিহ্ন ছিল ।এবং মৃতদেহগুলির সৎকার করা সম্ভব হয়নি। এই মতবাদ সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য নয় কারণ মহেঞ্জোদারোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও হরপ্পা সভ্যতার নগর গুলির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প খাটে না। এইচ. ডি.শাঙ্খালিয়া প্রশ্ন তুলেছেন যে, মহেঞ্জোদারো নগরটি ধ্বংসস্থলে তার অধিবাসীরা পরপর সাতবার আর  পুননির্মাণ করে থাকলে ভূমিকম্পের পর কেন তারা আর পুনর্নির্মাণ করল না।

সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন:-
           রাইকস,ডেলস,ম্যাকে,সাহানী প্রমুখেরা পতনের কারণ হিসেবে বর্ণার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এম .আর. সাহানীর  মতে প্লাবন সিন্ধু সংস্কৃতিকে ভাসিয়ে দেয়। রাইকস বলেন যে সিন্ধুনদের জল অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বন্যাও হয়েছিল। এর ফলে সিন্ধুনদকে অনেকাংশে দায়ী করা হয়। কারণ  সিন্ধু ও  তার শাখানদী গুলি ও অন্যান্য নদ নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এই সভ্যতার পতন ঘটে ।সিন্ধুনদর গতিপথ পরিবর্তন করলেও বন্দর মহেঞ্জোদারো তারা গুরুত্ব হাড়ায়। জলাভাব ও শুস্কতা বৃদ্ধির  ফলে মহেঞ্জোদারো ও তার পার্শবর্তী অঞ্চল সমূহে কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং এরই ফলে এই সভ্যতার পতন হয়।

বর্বর সংস্কৃতির প্রভাব:-
          হরপ্পা সভ্যতা লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাই বড়ো বড়ো ঘরগুলি ছোট ছোট আকারে ভাগ হচ্ছিল। ইতিমধ্যে বিভিন্ন  অনগ্রসর এলাকায় হরপ্পা সংস্কৃতি দ্রুত প্রসার লাভের  ফলে এসব অঞ্চলের বর্বরতা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করে এর ফলে হরপ্পা সংস্কৃতি মলিন ও জীর্ণ হয়ে পড়ে ।এই মত এখানে পর্যন্ত অনুমান মাত্র তবে সাধারণভাবে বলা চলে যে ওই সংস্কৃতির অবনতি এবং অবসানের জন্য অভ্যন্তরীণ কতটা দায়ী ছিল বিদেশিদের আক্রামন ততটা দায়ী ছিল না।

আর্যআক্রমণ:-
           বলা হয় যে ,বন্যা মহামারী সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন জলবায়ুর পরিবর্তন যেকোনো কারণেই হোকনা কেন হরপ্পা সভ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং শেষ পর্বে তার পতন ঘটেছিল রক্তাক্ত পথে ।বলা হয় যে, সিন্ধু পতাকায় খননকার্য গলিয়ে রান্নাঘর , কুয়োর ধান,রাস্তা প্রভৃতি স্থানে যত্রতত্র স্তুপকৃত কঙ্কাল পাওয়া গেছে ।যাদের মাথার পেছনে ভারী অস্ত্রঘাতের চিহ্ন এইসব মৃতদেহ গুলির কোন সৎকার হয়নি।  অনেকে মনে করেন যে, রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের ফলেই হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটেছিল ।এবং বিভিন্ন স্থানে সৎকার না করা স্তূপীকৃত মৃতদেহগুলি হল তারই প্রমাণ।
           হুইলার, স্টুয়ার্ড,পিগট, প্রমূখ মনে করেন যে, আর্যদের আক্রমণের ফলে এই সভ্যতার ধ্বংস হয়। এই মতবাদের সমর্থনে কিছু যুক্তি উপস্থিত করা হয়।
  1.ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং মাথার খুলিতে আঘাতের চিহ্নসহ সৎকার না হওয়া স্তূপীকৃত মৃতদেহগুলি প্রমাণ করেন যে আকস্মিক আক্রমণের ফলে এই সব নগরবাসী নিহত হয়েছিল। পণ্ডিতদের মধ্যে আর্যরা হয়েছিল আক্রমণকারী
  2.ভারতের আর্যদের আগমন এবং হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের সময় অদ্ভুতভাবে মিলে যায় ।এই দুটি সময়কাল আনুমানিক 1500-1400খ্রী: পূর্বাব্দ।
  3. ঋকবেদে বর্ণিত ঘর ইরিয়ূপিয়ার যুদ্ধকে হুইলার সহ অনেকে হরপ্পার যুদ্ধ বলে মনে করেন।
  4. ঋকবেদে দেবরাজ ইন্দ্র কে ‘পুরন্দর ‘বা নগরের ধ্বংসকারী বলে বর্ণনা করেছে। বলাবাহুল্য আর্যদের আগমন কালে হরপ্পা সভ্যতা ব্যতীত অপর কোন নগরী ছিল না।
  5. চানহুদারো,ঝুকর প্রভৃতি স্থানে  তামা-ব্রোঞ্জের তৈরি এক ধরনের  ঋজু ও লম্বা কুঠার পাওয়া গেছে। স্থানীয় কাঠুরের সঙ্গে এর কোন মিল নেই বরং ইরানিয়  কাঠুরের সঙ্গে মিল আছে।
                 এই মতবাদের কিছু দুর্বলতা আছে। 1.মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলির দ্বারা একমাত্র আর্য আক্রমণ প্রমাণিত হয়নি। এজন্য গৃহযুদ্ধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি কারণকে দায়ী করা যায়। 2.আর্য আক্রমণের মহেঞ্জোদারো ধ্বংস হলও সিন্ধুর অন্যান্য শহরে রক্তময়ী সংঘর্ষের প্রমাণ নেই।
3.আক্রমণকারীরা যে আর্য ছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না ।মার্কের মতে আক্রমণকারীরা ছিল বেলুচিস্তানের অধিবাসী। সুতরাং আর্যতও্ব বা আর্যক্রম তত্ত্ব সর্বংশে গ্রহণযোগ্য নয়।

উপসংহার:-
        তবে উপরিক্ত কারণগুলো ধ্বংসের জন্য মূলত দায়ী বলে মনে করা হলেও মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা অঞ্চলের অধিবাসীদের মানসিকতা এই সভ্যতা ধ্বংসের জন্য দায়ী ছিল। এই সভ্যতা ও সাংস্কৃতির  পতনের প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় আদিবাসীদের সীমাবদ্ধতা ।এই সভ্যতা ভারতের উর্বর অঞ্চলে বিস্তার লাভ করতে পারেনি ।যে অঞ্চলে এই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল অবশিষ্ট ভারতের তুলনায় সেগুলি ছিল অপেক্ষাকৃত উষার অঞ্চল। অরণ্য উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী অস্ত্রের প্রধান অন্তরাই ছিল অপরদিকে প্রাচীনকালে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সঙ্গে তুলনা করে সিন্ধু সভ্যতার বন্ধ্যাত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। নীল উপত্যকা বা ইউফেটিশ উপত্যকা আয়তনে বড় না হলেও অনেক শহর ছিল। কিন্তু সিন্ধু অঞ্চলের প্রকৃত শহর ছিল দুটি। অন্যান্য শহরগুলি ছিল নগণ্য। এইভাবে আর্যদের নানা কারণে এই সভ্যতা ধ্বংস হয়।
          
 

Leave a Comment

Translate »