ভারতবর্ষে মধ্যপ্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য গুলি লেখ?

ভারতবর্ষের মধ্যপ্রস্তর যুগের মূল বৈশিষ্ট্য আলোচনার শুরুতে উল্লেখ করা দরকার যে ,পুরাপ্রস্তর যুগের পর এসেছিল মধ্য প্রস্তর যুগ বা (Merolukaise) বা ক্ষুদ্রশ্মীয়(Microlithic) যুগ। এই সময়ে আবহাওয়ার এক বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। একদিন পর্যন্ত যে তুষারযুগ চলেছিল এখন তার অবসান হয়। আবহাওয়া হয়ে ওঠে শুষ্ক ও গরম ।এই পর্বে হাতিয়ার গুলি আকারে অতিক্ষুদ্র হওয়ায় এই পর্বকে Microlithic বা হ্মুদ্রাশ্মীয় পর্ব বলে আখ্যা দেয়া হয় । দৈর্ঘ্য এই হাতিয়ার গুলি ছিল 1 থেকে 8 সেমি ।এই জাতির হাতিয়ার পাওয়া গেছে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট ,অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক প্রভৃতি অঞ্চলে। গেলর,ঘেঙর,বাটালি,শল্ল, চাচনী ও তিকোন চতুর্ভুজ এই পর্বের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার। এই পর্বে কিছু অর্ধচন্দ্রাকার হাতিয়ার ও পাওয়া গেছে, হাতিয়ার গুলি সাধারণত কোয়ার্টজ, চাচ্ ক‌্যাল সাদানি ইত্যাদি পাথর দিয়ে তৈরি হয়।
পণ্ডিতরা মধ্যবর্গীয় কয়েকটি প্রস্তর ক্ষেত্রে আনুমানিক কালনির্ধারন করেছে। রাজস্থানের ভিলওয়ারন জেলার বাহরে এই পর্বের সূচনা হয়। আনুমানিক 5000খ্রী: পূ: প্রায় একই সময় আদিমগড়ে ক্ষুদ্রশ্মীয় পর্বের সূচনা হয়। গুজরাটের লঙ্খনাজে এসে হ্মুদ্রাশ্মীয় পর্বের সাংস্কৃতিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তা খ্রিস্টপূর্ব সহস্ব্রবদ্বের সমকালীন বলে নির্ণয় হয়েছে ।কিন্তু সরাইনাহরে এই হ্মুদ্রাশ্মীয় সংস্কৃতির সূচনা হয়েছে। আরোও অনেক পূর্বে 4000 খ্রিস্টপূর্ব পশ্চিমবঙ্গে বিরাহানপুরে একটি হ্মুদ্রাশ্মীয় সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র।এই প্রত্নহ্মেএ থেকে প্রচুর সামগ্রী পাওয়া গেছে ।কিন্তু রেডিও কার্বন পদ্ধতির আওতায় পড়ে এমন কোন জৈবিক নিদর্শন এখানে পাওয়া যায়নি।
গুজরাটের লংখনাজ এই পর্বের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ পত্নহ্মেএ। এখানে ১৪টি নরকঙ্কাল পাওয়া গেছে ।এখানে নর কঙ্কাল গুলির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দুটি ভিন্ন নরগোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায় ।এদের একটি প্যালিও ম্যাডিটারিয়ান ধরনের তামিল ভাষীদের মধ্যে দেখা যায়। অপরটি আদি অস্ট্রেলিয়া জাতীয় যেমন কোল ভিল ,সাঁওতালি, মুন্ডা, জুয়াং প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়।
ভীমবেটকারে কিছু গুহাচিত্রে এই পর্বের শিল্পকর্ম ধরা পড়েছে ।এখানে শিকারের ছবি বেশি বর্শা তীর-ধনুক প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্রের ছবি যেমন আঁকা আছে ঠিক তেমনই হাতি ,বাঘ ,ভাল্লুক ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির ছবির ও অভাব নেই ।মানুষের ছবি ও রয়েছে। মানুষ কখনো কখনো নীরাচরন নিরাভবন কখনো বা তার গায়ের পোশাক ও অলংকার গোষ্ঠীবদ্ধদের ছবিও চিত্রায়িত হয়েছে। শিশুসন্তানকে কবর দেওয়া হচ্ছে। আর তার শোকাত্ন পিতা-মাতা বিলাপ করছে ।এরূপ দৃশ্য আছে ছবিতে, গোলাপি, হলদে, বাদামি ,বেগুনি এসব রঙ্গে লাল রঙ্গের খড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। ছবিগুলিতে যেমন সামাজিক জীবন ফুটে উঠেছে ঠিক তেমনি শিল্পের নৈপুণ্য অনুরাগ প্রতিফলিত হয়েছে।
মধ্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির অগ্রগতি সর্বত্র একই হারে হয়নি ।এই সময় উত্তর ও মধ্য ভারতের বেশ কিছু স্থানে শুধু পশুপালন শুরু হয়নি চাষা আবাদের কাজ আরম্ভ হয়নি। অথচ তখনই দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে শিকার ও মাছ ধরার পর্ব চলছিল ।যাইহোক এই যুগের মূল পরিচায়ক হল 1 – 3 সেমি লম্বা সূক্ষ্ম দানা পাথরের তৈরি হাতিয়ারের ব্যাপক ব্যবহার। আলোচ্য যুগের হাতিয়ার গুলি একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে একটি বড় অংশ ছোট ছোট লম্বাটে চিল্কা বা লেপ লেট থেকে করা হয়েছে ‌। হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্যের কথা বাদ দিয়েও উল্লেখ্য যে এযুগের মানুষ সাংস্কৃতিক ও শারীরিক সাক্ষ্য অনেক বেশি পাওয়া যায়। ক্ষুদ্রপ্রস্তর যুগের নিরসনের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি পুরাপ্রস্তর যুগীয় নিদর্শনের ভৌগোলিক ব্যাপ্তির চেয়েও কিছু বেশি।

Leave a Comment

Translate »